নানা শঙ্কা কাটিয়ে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ। রাষ্ট্র সংস্কার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ কমিটির প্রধান হচ্ছেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। সদস্য হিসেবে হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামানকে মনোনীত করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এ দুজন বিচারপতির নাম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ কর্তৃক মনোনীত হওয়ায় তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ তৈরি করতে এই সার্চ কমিটি কাজ করবে।
জানা গেছে, ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত সার্চ কমিটি গঠন হয়ে গেছে। প্রজ্ঞাপনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাক্ষরও করেছেন। যে কোনো সময় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আর এই অনুসন্ধান কমিটির গঠনের মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরু হলো বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটি (অনুসন্ধান কমিটি) গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এ অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হয়। আইনে বর্ণিত যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিবেচনা করে তারা ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবেন। ১০ জনের মধ্য থেকেই ৫ জনকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি গঠন করবেন নতুন নির্বাচন কমিশন।
রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন। যার সভাপতি হন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। এ দুই বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন হবেন নারী।
তিন সদস্যের উপস্থিতিতে কমিটির সভা কোরাম হবে। এ কমিটির কাজে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সার্চ কমিটি গঠনের ১৫ কার্যদিবসের মধ্য সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, সার্চ কমিটি গঠন প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সকালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত সার্চ কমিটি গঠন হয়ে গেছে। প্রজ্ঞাপনে হয়তো প্রধান উপদেষ্টা স্বাক্ষরও করেছেন। আজ অথবা কালকের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এর মাধ্যমে বলতে পারেন আমাদের নির্বাচনমুখী প্রক্রিয়া গ্রহণ করার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, সার্চ কমিটি হয়ে গেলে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। এরপর ভোটার তালিকা সংশোধন করা হবে। আমরা তো ভুয়া নির্বাচন করব না। আমরা অসাধারণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করব।
অনুসন্ধান কমিটির দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পর্কে আইনের ৪ ধারায় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অনুসন্ধান কমিটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে এবং এই আইনে বর্ণিত যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অভিন্নতা, সততা ও সুনাম বিবেচনা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের উদ্দেশ্যে এই আইনে বর্ণিত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অনুসন্ধান করবে এবং এজন্য রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে নাম আহ্বান করতে পারবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে রাষ্ট্রপতির কাছে দুইজন ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবে কমিটি।
সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন সংস্কার করে ইসি পুনর্গঠনের চিন্তা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তবে রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার চাপ, ভোটার তালিকা তৈরি এবং নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে দ্রুত ইসি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে প্রতি বছরের ২ জানুয়ারি ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশ করা হয়। তার আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হয় ইসিকে। এছাড়া সংসদ নির্বাচনের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে। আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকা হালনাগাদের খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দায়িত্বও ইসির।
ফলে কমিশন না থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি ইসি সচিবালয় নিতে পারছে না। ইসি নিয়োগে কোনো আইন ছিল না। ২০১২ সালে এবং ২০১৭ সালে পরপর দুবার সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়। একইভাবে ২০১৭ সালে সার্চ কমিটি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন গঠন করে। পরে ২০২২ সালে ওই সার্চ কমিটি গঠনের বিধান রেখে ইসি নিয়োগে আইন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই আইনে ২০১২ ও ২০১৭ সালে গঠিত সার্চ কমিটির বৈধতা দেওয়া হয়।
গত ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক মাসের মাথায় গত ৫ সেপ্টেম্বর বিদায় নেন কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন, যাদের অধীনে এ বছরের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। পদত্যাগ করা অন্য কমিশনাররা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবীব খান, বেগম রাশেদা সুলতানা, মোহাম্মদ আলমগীর এবং আনিছুর রহমান।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়। সংস্কারসহ নানা ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ পর্যন্ত চার দফা বৈঠক করেছেন। আর এসব বৈঠকে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল দ্রুত সংস্কার কাজ শেষ করে নির্বাচনের রোডম্যাপের দাবি জানায়। এমনকি রাষ্ট্রপতির অপসারণ প্রশ্নে সাংবিধানিক সংকট হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে এমন আশঙ্কাও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।











