জে এস সেলিম
তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী হলেও ভারত কর্তৃক পানিশাসনের কারণে এ নদী এখন শুষ্ক মৌসুমে প্রায় মরে যায় এবং বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পানির এই অনিয়মিত প্রবাহের ফলে বাংলাদেশের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।
শীত ও গ্রীষ্মকালে ভারতের অভ্যন্তরে তিস্তার উজানে একাধিক বাঁধ ও ব্যারাজের মাধ্যমে পানি আটকে রাখা হয়। ফলে বাংলাদেশের অংশে নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে তিস্তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ থাকা উচিত ৫,০০০ কিউসেক, কিন্তু বর্তমানে তা নেমে আসে মাত্র ৩০০ কিউসেকেরও কম।
উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার কৃষক সেচের অভাবে চাষ করতে পারছে না, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখার পর বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহের ফলে নদী তীরবর্তী হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়।
তিস্তা পাড়ের ফসলি জমি, বসতভিটা, সড়ক ও অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়।
নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে।
তিস্তা পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।
২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশ ৫০:৫০ অনুপাতে পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার আপত্তি জানানোয় তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় আলোচনা চললে ও কার্যত বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যার পানি থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ন্যায্য অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছে।
২০১১ সালের প্রস্তাবিত চুক্তি দ্রুত কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পানি সংস্থার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ নদীগুলো পুনরুদ্ধার ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো।
বাংলাদেশ সরকার তিস্তা নদীর দুই পাড়ে ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ ও চ্যানেল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে নদী পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য একটি জীবন-মরণ প্রশ্ন। পানির ন্যায্য বণ্টন না হলে বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবন ভয়াবহ সংকটে পড়বে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সংকটের দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন, যাতে দুই দেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকে এবং তিস্তা পাড়ের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত হয়।



