স্টাফ রিপোর্টার: জে এস সেলিম
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট—একটি দিন, যা ইতিহাসে লেখা থাকবে রক্ত আর বিদ্রোহের কালিতে। দীর্ঘ ষোল বছর ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার একচেটিয়া দখল, অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য, ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এই দিনে বিস্ফোরিত হয়েছিল। এই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ—শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুবক, রাজনৈতিক কর্মী এবং স্বাধীনচেতা নাগরিক সমাজ।
তবে সত্যি বলতে, এই অভ্যুত্থান রাতারাতি ঘটেনি। এর শেকড় ছিল অনেক গভীরে।
ষোল বছরের স্বৈরতন্ত্র: কীভাবে জমেছে ক্ষোভ?
২০১০-এর দশকের শেষ থেকে শুরু হওয়া ক্ষমতার একাধিপত্য ক্রমেই আরও নিষ্ঠুর ও দমনমূলক হয়ে ওঠে। যারা ভিন্নমত প্রকাশ করেছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে দমন করা হয়েছে, কারাগারে পোরা হয়েছে, কিংবা গুম-খুনের শিকার হতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের উপর নিপীড়ন, শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস, বিচার বিভাগের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ, এবং সাধারণ মানুষের ন্যূনতম অধিকার হরণের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসে।
বিচারহীনতা ও মব জাস্টিসের শিকার রাষ্ট্র
এই সময়কালে ‘ন্যায়বিচার’ বলতে কিছু ছিল না। রাষ্ট্রীয় মদতে পরিচালিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। রাজনৈতিক নেতা, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক—যে কেউ শাসকের বিরুদ্ধে কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতো। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হতো অনেককে।
বিচার ব্যবস্থার ওপর শাসকগোষ্ঠীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকায় নিরপরাধ নাগরিকরা পর্যন্ত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়। ছাত্রসমাজের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ দমননীতি—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয় শাসকদলের ক্যাডার তৈরির কারখানায়।
৫ই আগস্ট: গণঅভ্যুত্থানের বিস্ফোরণ
কিন্তু ইতিহাস বলে, অন্যায় যত গভীর হয়, তার প্রতিরোধ ততই শক্তিশালী হয়। ষোল বছর ধরে জমানো ক্ষোভ, শোষণ, বৈষম্য, দমন-পীড়ন এক সময় ফেটে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে, শুরু হয় এক সর্বাত্মক বিপ্লব।
ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই অভ্যুত্থানে যোগ দেয় শ্রমিক-মজুর থেকে শুরু করে দেশের নানা স্তরের মানুষ। রাজপথে নেমে আসে লাখো জনতা, একসঙ্গে উচ্চারণ করে, “স্বৈরাচার নিপাত যাক!”
শাসকগোষ্ঠী প্রথমে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। তবে জনগণের আন্দোলনের সুনামি এতটাই প্রবল ছিল যে, শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে পারেনি। শহীদ হয় অনেক ছাত্র-জনতা, অনেকে চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
বিপ্লবের পর: নতুন ভোরের প্রত্যাশা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে এক নতুন ভোরের সূচনা হয়। বৈষম্যের অবসান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, ও শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠনের দাবি ওঠে সর্বস্তর থেকে।
এই বিপ্লব শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি চেতনার পুনর্জাগরণ—একটি রাষ্ট্রকে মুক্ত করার সংগ্রাম।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
আজ, যখন আমরা ফিরে দেখি সেই সংগ্রামের ইতিহাস, তখন আমরা মাথা নত করি শহীদ ও আহত বিপ্লবীদের সামনে। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে—শক্তিশালী শাসকের চেয়েও শক্তিশালী হয় সাধারণ জনগণের ঐক্য। আর তাই, আমাদের এই স্বাধীনতা, এই গণতন্ত্র—এটি কোনো দয়ার দান নয়, এটি রক্ত দিয়ে কেনা।
এই ইতিহাস আমরা ভুলব না। এই সংগ্রাম আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল।



