মোহাম্মাদ আব্দুল মতিন
সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. মঈনুল হাসান সাদিক একটি বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি বলেছেন, “আওয়ামীলীগ যারা আছেন তারা বিএনপি’র সদস্য হতে পারবেন, জাতীয় পার্টিতে যারা আছেন তারাও বিএনপির সদস্য হতে পারবেন।” এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—বিএনপি কি এখন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির জন্য ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে? একটি দল যারা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ এবং ‘গণবিরোধী’ বলে আন্দোলন করেছে, সেই দলের নেতা এখন যদি আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের স্বাগত জানান, তাহলে বিএনপির আদর্শগত অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির বিশ্বাসযোগ্যতা এমনিতেই বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আন্দোলনের ব্যর্থতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সুসংহত রাজনৈতিক রোডম্যাপের অভাব—সব মিলিয়ে দলটি জনসম্পৃক্ততা হারাতে বসেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। এর মধ্যে এমন বক্তব্য দলটির নীতিগত অবস্থান ও আদর্শিক প্রতিশ্রুতির বিপরীতে একটি বড় ধাক্কা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হলো আদর্শিকভাবে একনিষ্ঠ কর্মীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠন তৈরি করা—যেখানে আদর্শ হবে সবার উপরে। অথচ বিএনপি যদি এখন আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির নেতাদের দলে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?
স্থানীয় নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গাইবান্ধা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা দলীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে রাজপথে থেকেছেন, তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে এখন হঠাৎ করে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো তাদের হতাশ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটা তৃণমূল নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নের সামিল।
এমন এক সময়ে যখন জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে, বিএনপির এমন বিভ্রান্তিকর বার্তা দলের ভবিষ্যত কৌশল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। বিএনপি যদি আদর্শের জায়গা থেকে সরে এসে শুধুমাত্র ‘সংখ্যায় শক্তি বাড়ানো’র নাম করে ‘যে-কোনো নেতা পেলেই গ্রহণযোগ্য’ মনে করতে থাকে, তাহলে জনগণ কেন তাদের ওপর আস্থা রাখবে?
ডা. মঈনুল হাসান সাদিকের বক্তব্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কতটা সমর্থন করেন তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে এই বিষয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট অবস্থান না জানালে বিএনপির রাজনৈতিক বার্তা আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
একটি আদর্শিক দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নীতিগত অবস্থান ও আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা। পুনর্বাসনের নামে যদি সেই আদর্শ বিসর্জন দেওয়া হয়, তাহলে সেই দল আর রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখপাত্র থাকে না—পরিণত হয় সুবিধাভোগীদের দলে। বিএনপির উচিত হবে তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ ও জনআস্থার মূল্যায়ন করে বক্তব্য ও কৌশল নির্ধারণ করা—না হলে আগামী দিনে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।



