শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্কুলের দেয়ালে এখনও শেখ হাসিনার স্লোগান, ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিতর্কের ঝড়

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:১৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১১৮ Time View

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙা ক্লাস্টারের বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশপথ ও শ্রেণিকক্ষের সামনে এখনও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে স্লোগান এবং ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’-এর লেখা দৃশ্যমান থাকার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব লেখা কেন রয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তির নামে স্লোগান বা রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী কোনো লেখা থাকলে তার শিক্ষাগত প্রভাব কী? এসব বিষয় দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের হলেও নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক ও কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, যথাযথভাবে বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হলে দেয়ালে থাকা এসব লেখা ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসার কথা।

সভাপতি নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাঃ লাইজু বেগমের স্বামী মোজাফফর হোসেনকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়েছে এমন তথ্যের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, মোজাফফর হোসেন রামজীবন ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি ছিলেন। এ অবস্থায় পতিত সরকারের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

২০০৯ সালের শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে পুরনো অভিযোগ

বিদ্যালয়টির শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও রয়েছে পুরনো অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ২০০৯ সালে তৎকালীন বিদ্যালয় সভাপতি মোজাফফর হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ লাইজু বেগমকে বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন তৎকালীন সভাপতি যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন এবং নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার নিজের স্ত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে ওই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত হয়েছিল কি না এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াটি তৎকালীন বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

শুধু তাই নয়, স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ওই সময় আরও তিনজন নারী শিক্ষককে কয়েক লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

 

বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে স্থানীয়দের প্রশ্ন

১. সরকারি বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ ও শ্রেণিকক্ষের সামনে এখনও রাজনৈতিক স্লোগান কেন থাকবে?
২. ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ এখনও কোন নির্দেশনা বা অনুমোদনের ভিত্তিতে বহাল রয়েছে?
৩. বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে মোজাফফর হোসেনের মনোনয়ন কোন প্রক্রিয়ায় হয়েছে?
৪. তার রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
৫. ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক লাইজু বেগমের নিয়োগ কোন কমিটি ও কোন বিধিমালার অধীনে দিয়েছিল?
৬. তৎকালীন সভাপতি ও পরবর্তীতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের পারিবারিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো স্বার্থের সংঘাত হয়েছিল কি না?
৭. আরও তিন শিক্ষককে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?
৮. উপজেলা ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা সর্বশেষ কবে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন?

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫সহ বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশনা প্রকাশিত রয়েছে। ফলে পুরনো নিয়োগের বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রযোজ্য বিধিমালা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, অনুমোদনপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশ্ন হিসেবে দেখা হোক।

তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের দেয়াল ও স্থাপনায় থাকা রাজনৈতিক স্লোগান দ্রুত পর্যালোচনা, সভাপতি মনোনয়নের বৈধতা যাচাই এবং ২০০৯ সালের শিক্ষক নিয়োগসহ অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।

একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বিদ্যালয়টির সার্বিক পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মোছাঃ লাইজু বেগম, সভাপতি মোজাফফর হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

SpecDobavki

স্কুলের দেয়ালে এখনও শেখ হাসিনার স্লোগান, ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিতর্কের ঝড়

Update Time : ১২:১৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙা ক্লাস্টারের বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশপথ ও শ্রেণিকক্ষের সামনে এখনও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে স্লোগান এবং ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’-এর লেখা দৃশ্যমান থাকার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব লেখা কেন রয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তির নামে স্লোগান বা রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী কোনো লেখা থাকলে তার শিক্ষাগত প্রভাব কী? এসব বিষয় দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের হলেও নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক ও কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, যথাযথভাবে বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হলে দেয়ালে থাকা এসব লেখা ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসার কথা।

সভাপতি নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাঃ লাইজু বেগমের স্বামী মোজাফফর হোসেনকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়েছে এমন তথ্যের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, মোজাফফর হোসেন রামজীবন ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি ছিলেন। এ অবস্থায় পতিত সরকারের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

২০০৯ সালের শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে পুরনো অভিযোগ

বিদ্যালয়টির শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও রয়েছে পুরনো অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ২০০৯ সালে তৎকালীন বিদ্যালয় সভাপতি মোজাফফর হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ লাইজু বেগমকে বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন তৎকালীন সভাপতি যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন এবং নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার নিজের স্ত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে ওই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত হয়েছিল কি না এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াটি তৎকালীন বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

শুধু তাই নয়, স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ওই সময় আরও তিনজন নারী শিক্ষককে কয়েক লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

 

বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে স্থানীয়দের প্রশ্ন

১. সরকারি বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ ও শ্রেণিকক্ষের সামনে এখনও রাজনৈতিক স্লোগান কেন থাকবে?
২. ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ এখনও কোন নির্দেশনা বা অনুমোদনের ভিত্তিতে বহাল রয়েছে?
৩. বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে মোজাফফর হোসেনের মনোনয়ন কোন প্রক্রিয়ায় হয়েছে?
৪. তার রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
৫. ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক লাইজু বেগমের নিয়োগ কোন কমিটি ও কোন বিধিমালার অধীনে দিয়েছিল?
৬. তৎকালীন সভাপতি ও পরবর্তীতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের পারিবারিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো স্বার্থের সংঘাত হয়েছিল কি না?
৭. আরও তিন শিক্ষককে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?
৮. উপজেলা ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা সর্বশেষ কবে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন?

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫সহ বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশনা প্রকাশিত রয়েছে। ফলে পুরনো নিয়োগের বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রযোজ্য বিধিমালা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, অনুমোদনপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশ্ন হিসেবে দেখা হোক।

তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের দেয়াল ও স্থাপনায় থাকা রাজনৈতিক স্লোগান দ্রুত পর্যালোচনা, সভাপতি মনোনয়নের বৈধতা যাচাই এবং ২০০৯ সালের শিক্ষক নিয়োগসহ অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।

একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বিদ্যালয়টির সার্বিক পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মোছাঃ লাইজু বেগম, সভাপতি মোজাফফর হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।