বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭ লাখ বরাদ্দ, কাজ সোয়া ২ লাখের! সুন্দরগঞ্জে বিদ্যালয় সংস্কারে ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেট!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:০৮:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৭২ Time View

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা):

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় বিদ্যালয় মেরামত প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর এস্টিমেটে ১৪টি সুনির্দিষ্ট আইটেমের জন্য ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও মাত্র তিনটি আইটেমের আংশিক কাজ শেষ করে বাকি কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদার জিতেন্দ্রনাথ এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুজ্জামান সরকার যোগসাজশে সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ আত্মসাত করেছেন।

​কাগজে ১৪ আইটেম, বাস্তবে মাত্র তিনটির কাজ:
এলজিইডির অফিসিয়াল প্রাক্কলন শিট (স্কিম কোড: 13291-27-10001) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যালয়টির ভবন সংস্কার ও মেরামতের জন্য ১৪টি আইটেমে সর্বমোট ৭,০০,০০০.১৮ (সাত লাখ) টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কেবল ১, ২ ও ৪ নম্বর আইটেমের কাজ শেষ করা হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাকি ১১টি গুরুত্বপূর্ণ আইটেমের প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কোনো দৃশ্যমান কাজ বাস্তবে করা হয়নি।
​বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে যেসব কাজ গায়েব:
​সিঁড়িতে টাইলস (আইটেম ৩): ভবনের সিঁড়িতে নন-স্কিড হোমোজিনিয়াস গ্লেজড টাইলস বসানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
​রঙের কাজ (আইটেম ৬ ও ৭): অভ্যন্তরীণ দেওয়ালের অ্যাক্রিলিক পেইন্টে ২ লাখ ১৩ হাজার ৬২৭ টাকা এবং বাইরের দেওয়ালে আবহাওয়ারোধী রঙের জন্য ৬৩,১৭৮ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ভবনে কোনো নতুন রঙের ছোঁয়া লাগেনি।
​নিরাপত্তা গেট ও অফিস টেবিল (আইটেম ৮ ও ৯): ৩৬,৭২২ টাকা মূল্যের এমএস কলাপসিবল গেট এবং ২৪,৬১৬ টাকার মানসম্মত ল্যামিনেটেড অফিস টেবিল সরবরাহ করা হয়নি।
​গাঁথুনি ও ঢালাই (আইটেম ১০ ও ১১): ১২৫ মিমি (৫ ইঞ্চি) ইটের দেওয়াল গাঁথুনি এবং জয়েন্ট স্ল্যাবের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ শুরুই হয়নি।
​এসএস রেলিং ও পলিশ (আইটেম ১৩ ও ১৪): বারান্দার সুরক্ষায় এসএস হ্যান্ডরেলিং স্থাপন (বরাদ্দ ৪৯,৯৭২ টাকা) এবং দরজা-জানালায় ফ্রেঞ্চ পলিশের কাজও সম্পূর্ণ অধরা।
​ঠিকাদার ও সাবেক প্রকৌশলীর যোগসাজশের অভিযোগ:
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজটির দায়িত্বে থাকা বিতর্কিত ঠিকাদার জিতেন্দ্রনাথ সুন্দরগঞ্জে যেসব প্রকল্পের কাজ হাতে নেন, তার প্রায় প্রতিটিতেই অনিয়ম ও দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। এলজিইডি কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে তাড়াহুড়ো করে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে তিনি সরকারি অর্থ তুলে নেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
​অভিযোগে আরও প্রকাশ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান  এই দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ঠিকাদারের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে প্রাক্কলনের সিংহভাগ কাজ বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় তদারকি না করে ফাইল ছাড়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া হয়।
​বিদ্যালয়ের অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, সরকারি উন্নয়ন তহবিলের অর্থ লোপাটের এই অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে কাজটির শতভাগ বাস্তবায়ন এবং অভিযুক্ত ঠিকাদার জিতেন্দ্রনাথ ও তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুজ্জামান সরকারসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

বাড়িই কি সারের গোডাউন? কামারজানীতে আ’লীগ নেতার স্ত্রীর ডিলারশিপ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ!

৭ লাখ বরাদ্দ, কাজ সোয়া ২ লাখের! সুন্দরগঞ্জে বিদ্যালয় সংস্কারে ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেট!

Update Time : ০৪:০৮:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা):

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় বিদ্যালয় মেরামত প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর এস্টিমেটে ১৪টি সুনির্দিষ্ট আইটেমের জন্য ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও মাত্র তিনটি আইটেমের আংশিক কাজ শেষ করে বাকি কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদার জিতেন্দ্রনাথ এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুজ্জামান সরকার যোগসাজশে সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ আত্মসাত করেছেন।

​কাগজে ১৪ আইটেম, বাস্তবে মাত্র তিনটির কাজ:
এলজিইডির অফিসিয়াল প্রাক্কলন শিট (স্কিম কোড: 13291-27-10001) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যালয়টির ভবন সংস্কার ও মেরামতের জন্য ১৪টি আইটেমে সর্বমোট ৭,০০,০০০.১৮ (সাত লাখ) টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কেবল ১, ২ ও ৪ নম্বর আইটেমের কাজ শেষ করা হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাকি ১১টি গুরুত্বপূর্ণ আইটেমের প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কোনো দৃশ্যমান কাজ বাস্তবে করা হয়নি।
​বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে যেসব কাজ গায়েব:
​সিঁড়িতে টাইলস (আইটেম ৩): ভবনের সিঁড়িতে নন-স্কিড হোমোজিনিয়াস গ্লেজড টাইলস বসানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
​রঙের কাজ (আইটেম ৬ ও ৭): অভ্যন্তরীণ দেওয়ালের অ্যাক্রিলিক পেইন্টে ২ লাখ ১৩ হাজার ৬২৭ টাকা এবং বাইরের দেওয়ালে আবহাওয়ারোধী রঙের জন্য ৬৩,১৭৮ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ভবনে কোনো নতুন রঙের ছোঁয়া লাগেনি।
​নিরাপত্তা গেট ও অফিস টেবিল (আইটেম ৮ ও ৯): ৩৬,৭২২ টাকা মূল্যের এমএস কলাপসিবল গেট এবং ২৪,৬১৬ টাকার মানসম্মত ল্যামিনেটেড অফিস টেবিল সরবরাহ করা হয়নি।
​গাঁথুনি ও ঢালাই (আইটেম ১০ ও ১১): ১২৫ মিমি (৫ ইঞ্চি) ইটের দেওয়াল গাঁথুনি এবং জয়েন্ট স্ল্যাবের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ শুরুই হয়নি।
​এসএস রেলিং ও পলিশ (আইটেম ১৩ ও ১৪): বারান্দার সুরক্ষায় এসএস হ্যান্ডরেলিং স্থাপন (বরাদ্দ ৪৯,৯৭২ টাকা) এবং দরজা-জানালায় ফ্রেঞ্চ পলিশের কাজও সম্পূর্ণ অধরা।
​ঠিকাদার ও সাবেক প্রকৌশলীর যোগসাজশের অভিযোগ:
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজটির দায়িত্বে থাকা বিতর্কিত ঠিকাদার জিতেন্দ্রনাথ সুন্দরগঞ্জে যেসব প্রকল্পের কাজ হাতে নেন, তার প্রায় প্রতিটিতেই অনিয়ম ও দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। এলজিইডি কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে তাড়াহুড়ো করে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে তিনি সরকারি অর্থ তুলে নেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
​অভিযোগে আরও প্রকাশ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান  এই দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ঠিকাদারের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে প্রাক্কলনের সিংহভাগ কাজ বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় তদারকি না করে ফাইল ছাড়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া হয়।
​বিদ্যালয়ের অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, সরকারি উন্নয়ন তহবিলের অর্থ লোপাটের এই অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে কাজটির শতভাগ বাস্তবায়ন এবং অভিযুক্ত ঠিকাদার জিতেন্দ্রনাথ ও তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুজ্জামান সরকারসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।